বসন্ত প্রত্যাশী

বসন্ত প্রত্যাশী

আব্দুল মান্নান মল্লিক

ওই যে আবার আসছে ফিরে বসন্ত মরশুম,
কোকিল বনে কুহু রবে ভাঙবে বাংলার ঘুম।
সারা অঙ্গে পুষ্পগন্ধে ব্যজন মেলেছে নভস্বান্,
এলোমেলো বাতাসে রন্ধ্রে-রন্ধ্রে বসন্তের ঘ্রাণ।
গুঞ্জরণী শাখায় শাখায় খোঁজ করে যায় মধুপ,
পুষ্পকলি মেলবে ডানা মধুর নেশায় লোলুপ।
মৌপাখিরা খোঁজ নিয়ে যায় সকালে বিকালে,
মঞ্জরি সব ঘুমিয়ে আছে নাইরে মধু ফুলে।
জাগো হে বসন্ত অনন্ত ঘুম ঘুমাইও না আর,
শৈত্য প্রাচীর ভেঙে আনো ফুলের উপহার।
রঙবেরঙে সাজিয়ে ধরা পাখিদের দিও গান,
ফিরিয়ে দিও নবযৌবন বাংলা মায়ের প্রাণ।
ঐ যে বউল শাখায় শাখায় ফোটার অপেক্ষায়,
চেয়ে আছে ফুটবে কখন তোমার ভালবাসায়।
কচি পাতায় উঠবে সেজে শাখা ভরা ফুলে,
বয়ে দিও আলতো হাওয়া নাচবে দুলে-দুলে।
পুষ্প সৌরভ ছড়িয়ে দিও আকাশে বাতাসে,
শাখায় শাখায় নাচবে পাখি গাইবে উল্লাসে।
বাংলার মান বাংলার প্রাণ তুমিই অহংকার,
গৌরব তুমি সৌরভ তুমি বাংলার অলঙ্কার।

Advertisements

আমাদের মাতৃভাষা

আমাদের মাতৃভাষা

আব্দুল মান্নান মল্লিক

ঝরে পড়া পুষ্প পাপড়ি,
তাইতো আজ রাস্তায় গড়াগড়ি।
কি মূল্য আছে বল! তোমাদের কাছে,
অধুনা এই নতুন সমাজে।
গজিয়ে ওঠা সবুজ পত্রে
নতুনের স্বাদে ও গন্ধে।
লিপিবদ্ধ হয়ে গেছে নতুন পাতায়,
ভরিয়াছে বৈদেশিক শব্দে।
ছিল কি খুব বেশী প্রয়োজন?
তবে কেন এত আয়োজন?
নাট্য গল্প কাব্যে, ছন্দে ছন্দে ইংলিশ,
বাংলাকে করেছ বিক্রি,
মিশিয়ে দিয়েছ জর্জরিত বিষ।
যেথায় যখন যেমন,
থাকে যদি বিশেষ কারণ,
বিশ্বজুড়ে রাখ বন্ধুত্বের বন্ধন
প্রয়োজনে হোক ভাষার রূপান্তর,
তাতে নাই বারণ।
মাতৃশব্দ বিলীনের হেতু
ইংলিশে বিশ্বাস,
ক্ষণেক্ষণে এমনি একদিন
ইংলিশ করবে মাতৃভাষাকে গ্রাস।
একেক করে হয়েছে বিলীন
বাংলার কতো শব্দ।
বসেছে ইংলিশ, হয়েছে অছন্দোবদ্ধ।
বাংলার মান বাংলার গান,
মাতৃভাষা আমার বাংলার প্রাণ।

চ্যুতি

আব্দুল মান্নান মল্লিক

যেদিন তোমার বক্ষ ছাড়ি হলাম অধোগামী,
প্রাতের রবি হেসেছিল কেঁদেছিলাম আমি।
ক্ষণিক সুখের স্বপ্নঘোরে নিরব যখন হাসি,
চমকে দেখি কোথায় আমি অসহায় প্রবাসী।
যখন যেটা চাইতাম কাছে ধরা দিত হাতে,
নুরের বাতি দিবা-নিশি জ্বলত অবিরতে।
গুলবাগিচায় খেলার আসর মুখে শুধু হাসি,
অজ্ঞাত কোন ভুলের বসে হলাম শ্রমবাসী।
কি জানি কি হারিয়ে খুজি করি হায় হায়,
সব হারিয়ে নিস্ব আমি আজ আর কিছু নাই।
বদলে গেছে সময় যত মনে পড়েনা হায়,
ছিনিয়ে নিয়ে স্মৃতিকথা বাক্য দিলে তাই।

নিদর্শন

নিদর্শন

আব্দুল মান্নান মল্লিক

কখনো-সখনো অদূর উদ্যানে
দৃশ্য গোচর।
খসে পড়া ইঁট নির্জনে,
সাক্ষ্য ঐ ভাঙা ঘর।
নাচেনা আর বাইজি সেথা,
বসেনা সুরা-পানের আসর।
খণ্ডিত পিয়ালা সুরা-পান করা,
হয়তো বা আজও মাটির ভিতর।
আরও সেথা শুকিয়ে যাওয়া,
রক্ত দিঘির ধারে ভগ্ন খঞ্জর।
কষ্টে ঠাহরি, হয়তো গজ-অস্থি,
কখনো ভাসে মাটির উপর।
রাত দুপুরের পর?
ওড়না উড়ানো বাইজীর পদধ্বনি ,
ঘরের চত্বর।
রিনিঝিনি বাজে কাঁকন ,
যদি হয় চাঁদ হারানো ভোর।
আছে কিনা কেউ কি জানে,
তাদের বংশধর।
হয়তো বা জীবিত
নিভৃতে গুনিছে প্রহর।
শুকানো রক্তাক্ত গায়ে,
কাঁদিছে আজও ঐ পলাশীর প্রান্তর।
কোথায় গজ, অশ্ব।
কোথায় সৈনিক লোক-লস্কর।
কেউ জানে কি তাদের খবর?

আমার ভুবন জন্মভূমি

আমার ভুবন জন্মভূমি

আব্দুল মান্নান মল্লিক

বাংলা আমার জন্মভূমি আমার ছোট্ট ভুবন,
তোমার কোলে জন্ম নিয়ে গর্বে ভরে মন।
যেথায় রাতে চাঁদের আলো দূর আকাশের তারা,
সেথায় আমার জন্মভূমি কালের স্রোতধারা।
গাছে গাছে জোনাকি বাতি পাখির গানে ভোর,
দিনের আলোয় বাংলা শোভন পুষ্পে মধু চোর।
এদিক ওদিক যেদিকে চায় ছোট্ট ভুবন আমার,
রংবেরঙের পাখপাখালি ফুলের চমৎকার।
মাথায় মাথায় সারিতে হাঁটে মিটিমিটি হাসি,
তারায় তারায় যাচ্ছে ওরা চাঁদের মাসি পিসি।
জলপাখিরা সাঁতার কাটে শাপলা ফোটা জলে,
মেঘলা হাওয়া ঢেউ বয়ে যায় পারের কাশফুলে।
খাল বিল আর পুষ্করিণী কোথাও জলাভূমি,
সবুজ ঘেরা মনোরম সেতো আমার জন্মভূমি।
শিউলি ঝরা উঠান আমার কোথায় পাবো আর,
ঘর ছেড়ে যায় পথের ধারে বুনোফুলের বাহার।
রূপ জৌলুশ সুরভি বাতাস সারা বাংলা জুড়ে,
চাইনা আমার দালানকোঠা হোকনা ঘর কুঁড়ে!
এইতো আমার জন্মভূমি এইতো আমার ভুবন,
এইতো আমার সপ্তস্বর্গ এইতো আমার জীবন।

আষাঢ়ে খরা (১৪২৫)

আষাঢ়ে খরা (১৪২৫)

আব্দুল মান্নান মল্লিক

আকাশ তুমি আষাঢ় মাসে কাঁদবে কবে আর,
আশায় আশায় দিন ফুরালো শুকায় জলাধার।
শুকনো পাতায় নূপুর বাজে ডাঙায় চরে বক,
পানকৌড়ি ভাবছে বসে পোহায় দুঃখ-শোক।
ঝিঙে ফুল খালে বিলে কোথাও জন্মে তরু,
রাখাল ছেলে গাছের ছায়ায় গাঙে চরে গরু।
চলত যেথায় নৌকা-ডিঙে গরুর গাড়ি চলে,
থৈ-থৈ থৈ হাঁসের পাল দিঘীর ঘোলা জলে।
লূতার জালে বর্ষার ছাতা সবার ঘরে ঘরে,
আষাঢ় মাসে চাতকেরা জল পিপাসায় মরে।
অগ্নিঝরা রোদ্রতাপে হালফিল আষাঢ় মাস,
বৃষ্টি নাইরে আষাঢ় মাসে পুকুর ভরা ঘাস।

ভোজবাজির এই দুনিয়াতে

ভোজবাজির এই দুনিয়াতে

আব্দুল মান্নান মল্লিক

বাড়তে থাকে দিন বাড়তে থাকে বয়স,
লোভে পাপ পাপে মৃত্যু বড়ই আপসোস।
কি আনন্দ কি আনন্দ মোহে পড়েছি ধরা,
লুয়ে লুয়ে চিত্ত শুকাই দু’চোখে নামে খরা।
মধুর আদল গরল পানে পড়ে গেছি বাঁধা,
স্বপ্ন নাকি আদত জীবন বিশ্ব গোলকধাঁধা।
কুহকী তুই প্রবঞ্চক তুই বাঁধলি ছলেবলে,
তোর উঠানে বন্দি আমি মোহ মায়াজালে।
বিশ্বটারে দেখতে চেয়ে শতরঞ্জের কারসাজি,
দুনিয়াটা বহুরূপী ঠকবাজি আর ভোজবাজি।
স্রোত বয়ে যায় সময় যত চতুর্দিকে ফাঁকা,
যেদিকে চায় ডাইনে বাঁয়ে আমি আস্ত বোকা।
তোর দুয়ারে বৃথাই আমি পুণ্য হিসাব করি,
ধন্য জীবন বিফল গেল পাপে ডুবে মরি।
কোথায় রত্ন সোনার খনি পঙ্কিল শুধু সার,
তোর উঠানে ঘুরে ঘুরে হলাম কদাকার।
শৈশবের সেই স্বপ্ন ছিল ভাবনা ছিল অনেক,
দিন ফুরানো সাঁঝের বেলায় ভাবতে উদ্বেগ।
রূপের জৌলুস ছুটে আসে প্রমোদ উল্লাস,
অভ্যন্তরে প্রবেশ করি নোংরামিতে বাস।
দিনের শেষে পারের গুটির অঙ্ক কষে দেখি,
সব হারিয়ে ফিরে পেলাম জলে ভরা আঁখি।

 

মান্নান, বয়স 52+, বর্তমান বাসস্থান – মুর্শিদাবাদ, থানা রেজিনগর, গ্রাম মরাদিঘী